বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন :-
সিলেটের সীমান্তবর্তী পর্যটন এলাকা জাফলং। ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটলেও, জাফলংয়ের আকাশে এখনো কাটেনি আতঙ্কের মেঘ। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর বড় বড় রাঘববোয়ালরা আত্মগোপনে চলে গেলেও ব্যতিক্রম চিত্র দেখা যাচ্ছে ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নে। সেখানে প্রশাসনের নাকের ডগায় বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছেন একাধিক হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি এবং আওয়ামী লীগের দাপুটে নেতা মামুন পারভেজ।
প্রশাসনকে ‘বৃদ্ধাঙ্গুলি’ দেখিয়ে তার এই প্রকাশ্যে বিচরণ নিয়ে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সুশীল সমাজ ও সাধারণ জনতা।
ক্ষমতার অপব্যবহার ও কোটি টাকার সাম্রাজ্য
মামুন পারভেজ, যার নেপথ্য পরিচিতি ছিল সাবেক এক প্রভাবশালী এমপির ‘খাস লোক’ হিসেবে। মৃত মইনুল হোসেনের পুত্র মামুন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাব খাটিয়ে ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের চেয়ার দখল করেন। চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে তিনি ইউনিয়ন পরিষদকে পরিণত করেছিলেন ব্যক্তিগত ‘টর্চার সেল’ এবং সিন্ডিকেটের আস্তানায়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইউনিয়ন পরিষদের একটি নির্দিষ্ট কক্ষ তিনি একক নিয়ন্ত্রণে রাখতেন, যেখানে মূলত মাদক সংক্রান্ত কারবার এবং চোরাচালানের পরিকল্পনা চলত। অভিযোগ রয়েছে, জাফলং সীমান্তের পাথর ও বালু মহাল থেকে শুরু করে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প পর্যন্ত—প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছরের ব্যবধানে তিনি নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
মামলার বিবরণ ও আইনি জটিলতা
অনুসন্ধানে জানা যায়, আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নে গুম ও বিভিন্ন হত্যাযজ্ঞের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে মামুন পারভেজের বিরুদ্ধে গত ৩০/১২/২০২৪ তারিখে সিলেট কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর: ৫০/৫৮৭। এছাড়া গোয়াইনঘাট থানায় তার বিরুদ্ধে আরও একটি মার্ডার মামলা রয়েছে, যার নম্বর: জিআর ১৯১/২৪ (গোয়াইনঘাট)।
ভয়ংকর সব অপরাধের এজাহারভুক্ত আসামি হওয়া সত্ত্বেও রহস্যজনকভাবে সে এখনো গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীরা।
জুলাই হত্যাকাণ্ডের ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে পরিচিতি
জুলাই বিপ্লবের সময় যখন রাজপথ ছাত্র-জনতার রক্তে রঞ্জিত হচ্ছিল, তখন সিলেটে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে ছিলেন এই মামুন পারভেজ। তিনি ২নং পশ্চিম জাফলং ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক এবং গোয়াইনঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের সক্রিয় সদস্য।
অভিযোগ রয়েছে, জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত সিলেটের কোতোয়ালি ও শাহপরাণ এলাকাসহ বিভিন্ন পয়েন্টে আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলায় মামুন ও তার অনুগত বাহিনী সক্রিয় ছিল। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সরাসরি হামলা ও ছাত্র হত্যার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা নিয়ে ভুক্তভোগীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। ৫ই আগস্টের পর কিছুদিন পলাতক থাকলেও, পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে আসতেই তিনি পুনরায় এলাকায় ফিরে এসে আওয়ামী এজেন্ডা বাস্তবায়নে তৎপর হয়ে উঠেছেন।
মামলার ফাইলবন্দি দাপ্তরিক তথ্য
পুলিশি নথি ও অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৩০ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে সিলেট কোতোয়ালি থানায় মামুনের বিরুদ্ধে একটি চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলা দায়ের করা হয় (মামলা নম্বর: ৫০/৫৮৭)। এছাড়া গোয়াইনঘাট থানায় তার বিরুদ্ধে আরও একটি মার্ডার মামলা রয়েছে (জিআর ১৯১/২৪)।
হত্যা ও গুমের মতো ভয়ানক অপরাধের আসামি হয়েও তিনি এলাকায় প্রকাশ্যে মহড়া দিচ্ছেন, যা এলাকাবাসীকে স্তম্ভিত করেছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন—যিনি আদালতের খাতায় ‘ফেরারি’, তিনি কীভাবে জনসম্মুখে দাপট দেখিয়ে চলেন?
তবে বিষয়টি নিয়ে সিলেটের পুলিশ সুপারের (এসপি) সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি কঠোর অবস্থানের কথা জানান। তিনি বলেন, "আসামি যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আমরা বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। সে কোথায় অবস্থান করছে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলেই আমরা তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনব।"
জনসাধারণের দাবি: 'দ্রুত গ্রেফতার ও বিচার'
মামুন পারভেজের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও তার বাহিনীর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ জাফলংয়ের সাধারণ মানুষ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, "সরকার পরিবর্তন হয়েছে শুনি, কিন্তু আমাদের এখানে তো মামুনের শাসন এখনো রয়ে গেছে। সে প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরলে আমরা জানমালের নিরাপত্তা পাব কোথায়?"
সীমান্তে চোরাচালান রোধ এবং এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনতে মামুন পারভেজকে দ্রুত গ্রেফতারের দাবি জানিয়েছেন ছাত্র-জনতা ও স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ।